এই দিন

বুধবার   ২৮ অক্টোবর ২০২০   কার্তিক ১২ ১৪২৭   ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

১৯৬

করোনায় ব্যর্থ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা!

প্রকাশিত: ১৫ এপ্রিল ২০২০  


  রহমান মৃধা
মনে হচ্ছে গত কুড়ি বছর ধরে ডিজিটাল প্রযুক্তির জগতে গোটা বিশ্ব ডুবে ছিল। আমরা কম্পিউটারকে ভাইরাস মুক্ত করতে সক্ষম হয়েছি, অথচ আমাদের শরীরের ভাইরাস সরাতে বা ভাইরাসে আক্রান্ত হলে তাকে মুক্ত করতে সক্ষম হয়নি আজ পর্যন্ত। কী কারণ থাকতে পারে এর পেছনে?


আমি বিশ্বের নামকরা তিনটি কোম্পানি ফার্মাসিয়া, আপজন এবং ফাইজারে কাজ করেছি। এতটুকু জানি কখন এবং কোন পরিবেশে এসব বড় বড় কোম্পানি নতুন ওষুধ তৈরি করতে আগ্রহ দেখায়। প্রথমত তারা দেখে মার্কেটের অবস্থা কেমন এবং কোন ধরনের মানুষের এসব রোগ হয়।

বিশ্বের এসব বড় বড় কোম্পানি তখনই একটি নতুন ওষুধ তৈরি করতে রাজি হয়, যখন তারা দেখে মার্কেটে উক্ত ওষুধটির চাহিদা ভালো, রুগীর সংখ্যা প্রচুর এবং এ রোগ স্থায়ীভাবে নিরাময় হবে না। যে অর্থ ইনভেস্ট করতে হবে সে অর্থ ফিরে পাওয়া যাবে। সব শেষে প্যাটেন্টের নিশ্চয়তা এবং রেগুলেটরি বিষয়ের উপরও গুরুত্ব দিয়ে থাকে।

বলা যেতে পারে, একটি বিজনেস প্লান করে এবং যদি কোম্পানি মনে করে ব্যবসায় লাভবান হওয়া যাবে, তখন নতুন অসুখের জন্য নতুন ওষুধ তৈরি করে। তা না হলে রিসার্চ অথবা বড় জোর ডিসকভারি ফেজ (discovery phase) অবধি কাজ করার পর তেমন কিছু ঘটে না।

এখন যদি বলি, টেলিফোন যেমন ধাপে ধাপে উন্নতি লাভ করেছে ঠিক করোনাভাইরাসও তেমন ধাপে ধাপে ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। তাহলে কি খুব বেশি বলা হবে? না, মোটেই না।

আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেলের সেই প্রথম টেলিফোন আর আজকের আইফোনের যে গুণগত পরিবর্তন হয়েছে ব্যবহারিক দিক দিয়ে, ঠিক তেমনি করোনা তার গুণগত ভয়াবহ রূপ সার্স, মার্স এখন কোভিড-১৯ হয়ে এসেছে আমাদের মাঝে। ব্যবহারিক এবং গুণগত পরিবর্তন স্বত্বেও টেলিফোন টেলিফোনই, ঠিক তেমনি ভাইরাস ভাইরাসই।

চলুন পাঠক, আমরা ফিরে যাই ২০০২, ২০১২ এবং এবার ২০১৯ সালে। করোনাভাইরাসের ওপর রিসার্চ হয়েছে তবে ভ্যাকসিন তৈরি হয়নি। কেন? ভ্যাকসিন একবার প্রয়োগ করলে রোগী সুস্থ থাকবে। বারবার রোগটি হবে না।

সুতরাং এ ভ্যাকসিন ব্যবসা সফল হবে না। কোনো কোম্পানিই তাই আগ্রহ দেখায়নি। সাধারণত যখন কোন কোম্পানি আগ্রহ না দেখায় এই ধরণের ওষুধ তৈরি করতে, তখন বিশ্বের মানুষ আশা করে WHO (World Health Organisation) এ ধরণের সমস্যার সমাধান করবে। দুঃখের বিষয় যদি একটু সহজ করে কঠিন কিছু বলি তবে বলব অনেক সময় এসব সংস্থা “জাস্ট গুড ফর নাথিং।”

শুধু WHO না, EU (European Union), UN (United Nation) একই ক্যাটাগরির মধ্যে পড়ে। জাতিসংঘ বারবার ব্যর্থ হচ্ছে বিশ্বের নানা সমস্যার সমাধান করতে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন দরকারে একমত হতে পারছে না। ন্যাটো মিটিং ছেড়ে চলে যাচ্ছে। তবে যারা এসব সংস্থাগুলোর বড় বড় পোস্টে কাজ করছে, সব ধরণের সুযোগ সুবিধা ভোগ এবং বিপদগ্রস্ত অসহায় মানুষের অর্থে রাজকীয় জীবনযাপন করছে, তাদেরকে যদি বলি “Shame on them” তবুও বেশ কম বলা হয়।

বিশ্বে এ ধরণের সংস্থার কাজকর্ম এবং নানা সঙ্কট দেখলে মনে হয়, বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রতিকুল অবস্থা থেকে এরা খুব একটা দূরে নয়। এবার বলি, কোভিড-১৯ এবং কী সমস্যার কারণে এত লোকের মৃত্যু বর্তমান বিশ্বে।

নিউমোনিয়ার কথা ছোট বেলা থেকে শুনে আসছি আমরা। নিউমোনিয়া হলো ফুসফুস ও শ্বাসতন্ত্রের রোগ। ভাইরাসের সংক্রমণ এবং এর পরবর্তী প্রদাহ থেকে এ রোগ হয়। সংক্রমণ হতে পারে ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, ছত্রাক, বর্তমান কোভিড-১৯ ইত্যাদি দ্বারা।

সব সর্দি-কাশিই নিউমোনিয়া নয়। যখন জ্বর এবং এর সঙ্গে থাকে কফ ও শ্বাসকষ্ট, তখনই কেবল শ্বাসতন্ত্রে প্রদাহ হয়েছে বলে ধরা হয়। নিউমোনিয়া মৃদু বা হালকা থেকে জীবন হানিকরও হতে পারে। এ অসুখ বছরব্যাপী হতে পারে।

প্রতিবছর নিউমোনিয়ার কারণে অনেক শিশু এবং বৃদ্ধ মারা যায়। তাই আগে থেকে সাবধান হওয়া দরকার। যদিও এখন বিশ্বের সর্বত্রই নিউমোনিয়ার টিকা দেওয়া হয় যদি সেটা কোভিড-১৯ ভাইরাস না হয়। জ্বর-কাশিতে আক্রান্ত হলে ঘন ঘন শ্বাস নিলে বা শ্বাসের সঙ্গে বুক বা পাঁজর নিচে দেবে যেতে থাকলে সতর্ক হতে হবে, কারণ লক্ষণটি কোভিড-১৯ এর।

কোভিড-১৯ হলেই যে নিউমোনিয়া হবে তা কিন্তু নয়। এখন কাদের নিউমোনিয়া হবার সম্ভাবনা বেশি? ছোট্ট শিশু ও বয়স্ক ব্যক্তিরা বহুদিন ধরে ভুগছে এমন কোনো রোগ থাকলে। যেমন ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, ফুসফুসের অন্য কোনো রোগ, এইডস ইত্যাদি।

যাদের অন্য কোনো কারণে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেছে যেমন ক্যানসারের চিকিৎসা নিলে বা যারা অতিরিক্ত ধূমপান করে। সাধারণ নিউমোনিয়ার চিকিৎসা বাড়িতেই সম্ভব। নিউমোনিয়া ভালো হতে দুই থেকে তিন সপ্তাহ লেগে যেতে পারে।

এ সময় গরম পানি, লবণ-পানি বা লাল চা বা অ্যালকোহল দিয়ে গড় গড় করা যেতে পারে। অবস্থা সংকটাপন্ন হলে অর্থাৎ খুব বেশি শ্বাসকষ্ট হলে অবশ্যই দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে।

রক্তপ্রবাহে জীবাণুর সংক্রমণ ফুসফুসের চারপাশে ফ্লুয়িড জমা হয়। এই ফ্লুয়িডের কারণে ফুসফুসে ঘা হয়ে ক্ষত হতে পারে, যার ফলে শ্বাস প্রশ্বাস নিতে তীব্র কষ্ট হয়। সেক্ষেত্রে হাসপাতালের চিকিৎসা নিতে হবে।

অক্সিজেন মাস্ক এবং শেষ চেষ্টা ভেন্টিলেটর বা রেসপারেটর হতে পারে এর সমাধান। কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত বয়স্কদের ইমিউন সিস্টেম দুর্বলের কারণে দেখা যাচ্ছে মৃত্যুর সংখ্যা বেশি।

সুখবর হলো, যারা নিয়মিত খেলাধুলা বা ব্যায়াম করে, তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি থাকার কারণে সাধারণত এসব অসুখে তারা কম ভোগে। হ্যাঁ, নিউমোনিয়া প্রতিরোধযোগ্য রোগ। সচেতন হলে সহজেই প্রতিরোধ করা যায়।

যেমন যারা কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত তাদের থেকে দূরে থাকতে হবে। একইসঙ্গে মনে রাখতে হবে কোভিড-১৯ এ আক্রান্তের সংখ্যা যতবেশি হবে ততবেশি বিশ্বের মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী হবে, যা মানুষ জাতির জন্য এই ভয়ঙ্কর ভাইরাস থেকে রক্ষা পেতে ভালো কাজে দেবে।

বর্তমানে নানা ধরণের রিসার্চ কোভিড-১৯ এর প্রতিরোধের ওপর। হয়ত শিগগির একটি গ্রহণযোগ্য ভ্যাকসিন আমরা পেয়ে যাব। তার আগে অনেক কাছের মানুষকে হারাব। এর জন্য সতর্কতা হিসাবে আমাদের নিয়মিত হাত ধুতে হবে। ধূমপান বন্ধ করতে হবে। কারণ, ধূমপান ফুসফুসের রোগ প্রতিরোধ করার ক্ষমতা ধ্বংস করে দেয়।

বাংলাদেশের অনেক জেলায় মেডিকেল কলেজ থাকলেও কয়টি আইসিইউ বেড আছে? কয়টি ভেন্টিলেটর আছে? কতগুলো অক্সিজেন মাস্ক আছে? কোভিড-১৯ ভাইরাস সনাক্তে দেশের লোক কোথায় গিয়ে পরীক্ষা করবে?

সঠিক কোভিড-১৯ পরীক্ষার জন্য ১০০% নিশ্চিত কোন কিট নেই। তবে পিসিআর (Polymerase Chain Reaction) যন্ত্রটি একমাত্র গ্রহণযোগ্য মেশিন। যদি সেটার ব্যবস্থা না থাকে তাহলে কীভাবে কোভিড-১৯ সনাক্ত করা হবে এবং চিকিৎসাসেবা দেওয়া হবে কীভাবে?