এই দিন

রোববার   ২৫ অক্টোবর ২০২০   কার্তিক ১০ ১৪২৭   ০৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

১৪৩

দেশব্যাপী মাথা ন্যাড়া করার হিড়িক

প্রকাশিত: ১৪ এপ্রিল ২০২০  

চারদিকে ভাই টাক টাক
চলছে কলরব
টাক হয়েছে টাক হয়েছে
ছেলে বুড়ো সব।

যশোরের শার্শা উপজেলার পান্থপাড়ার মুহাম্মদ রুহুল আমিনের ‘গড়াগড়ি’ নামের কবিতার শুরু ছিল এরকম। এটি ১৯৯৮ সালের মার্চ মাসে তিনি লিখেছিলেন। এখন ২০২০। চারিদিকে টাকের ছড়াছড়ি দেখে সেই কবিতাটি মনে পড়ে। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবরোধে টানা ছুটির মধ্যে মাথা ন্যাড়া করার ধুম পড়েছে। শিশু, কিশোর, যুবক, বুড়ো সবাই মাথার দিকে নজর দিয়েছে। মাথা ন্যাড়া করার মধ্যে কি আছে নিজেরাও জানে না কেউ। তবে এক প্রকার শান্তি অনুভব করছে সবাই এটা বোঝা যায়। মাথা ন্যাড়া করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি পোস্ট দেওয়ার মধ্যেও যেন অন্য রকম এক অনুভূতি কাজ করছে। ফেসবুক খুললেই এরকম দৃশ্যেও ছবি ভেসে উঠছে।

আনিছ মালিটা নামের এক কবির কবিতা এরকম-‘টাক! টাক! ঠুকঠাক, মাথা ভরা বেল টাক। শীত কিংবা গ্রীষ্মে, বউয়ের সাথে রাগ হলে, কথায় কথায় চুল ছেড়ে, বাজারে গিয়ে চুল ন্যাড়া করে।’ এরকম কিছু নয়। এখন অন্যরকম ন্যাড়া হওয়ার প্রতিযোগিতা।

কোনো কোনো এলাকায় মাথা ন্যাড়াদেও বলা হতো ঠুল্লা মাথা। শৈববে এই ঠুল্লা মাথা হাসির খোরাক ছিল। মাথা ন্যাড়া কওে স্কুলে গেলে অন্যরা ভেঙচি কাঠটতো।

ঠুল্লা মাথা
বেলের পাতা
আর কবিনি মিছা কথা?

মিথ্যা কথা বললেই মাথা ন্যাড়া করা হতো-এ কথা শিশু-কিশোরদের মধ্যে প্রচলিত ছিল। ন্যাড়া মাথা নিয়ে আরও কত কথার প্রচল ছিল। এলাকায় এলাকায় ভিন্ন ভিন্ন ছড়া ছিল ন্যাড়া মাথা নিয়ে।

এখন কিন্তু এসবের বালাই নেই। কে কি মনে করল আর না করল তাতে কিছু যায় আসে না। সবার নজর এখন চুলের প্রতি।

এনাম আহমেদ একজন স্বাস্থ্যকর্মী। হাসপাতালে যেতে হয় রোজ। করোনার কারণে প্রতিদিন হাসপাতাল থেকে ফিরে গোসল করতে হয়। আবার বাইরে বের হলেই গোসল করতে হয়। তিনি কোনো গুজবে নয়, সুবিধার জন্য মাথা ন্যাড়া করে ছবি পোস্ট করেছেন ফেসবুকে। নড়াইল থেকে তিনি ছবি পোস্ট করেছেন। অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান মাথা ন্যাড়া করেছেন দু তিনদিন আগে। ঢাকার এই আইনজীবী ফেসবুকে শুধু লিখেছেন, ‘আমিও--’। 

হেলেন সাদী রাজধানীর পীরেরবাগের বাসিন্দা। গত ৭ এপ্রিল দুই ছেলের মাথা ন্যাড়া করে দিয়েছেন। ওইদিনই ফেসবুকে দুই ছেলের ছবি পোস্ট দিয়ে লিখেছেন,‘টাকলু পরিবারে স্বাগতম। শুভ কামনা দুই টাকলু বাবার জন্য। ওদের জন্য দোয়া করবেন.. .. ..”। ফেসবুকে মাথা ন্যাড়া করার ছবি আপলোড করার যেন প্রতিযোগিতা চলছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেশের বিভিন্ন এলাকার মানুষের ন্যাড়া হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে।

হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জে করোনা ঠেকাতে লকডাউন চলছে। সেখানে ঘরে বসেই মানুষ মাথার চুল ফেলে দিচ্ছে। গত কয়েকদিনে টাঙ্গাইলের সখীপুর, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে, হবিগঞ্জ, সিলেটের বড়লেখা, যশোরের বানারীপাড়া, নোয়খালীর সুবর্নচর, নেত্রকোনার কেন্দুয়া, কক্সবাজার, ঢাকার বিভিন্ন এলাকা, গাজীপুর, নড়াইল, বাগেরহাটসহ বিভিন্ন এলাকায় মাথা ন্যাড়া করার ধুম পড়েছে। করোনা ভাইরাস থেকে মুক্তি পেতে মাথা ন্যাড়া করা হচ্ছে বলেও এসব স্থান থেকে খবর আসছে। যদিও এ ধরণের খবরের কোনো ভিত্তি নেই যে মাথা ন্যাড়া করলেই করোনার আক্রমন থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে।

জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল ছাত্র, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্ররাও মাথা ন্যাড়া করছে দলবদ্ধ হয়েই। আবার সেগুলোর ছবিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া হচ্ছে। মাথা ন্যাড়া করার সুবিধাও আছে। এটি ক্ষতিকর কিছু নয়। গ্রীষ্মের এই সময় একটু আরামদায়ক। স্কুল কলেজ বন্ধ থাকায় ছাত্রদের অনেককেই ন্যাড়া করে দেওয়া হচ্ছে।  আবার করোনার কারণে সেলুন বন্ধ থাকায় অনেকেই অনির্দিষ্টকালের এই ছুটিতে চুল ছেটে ফেরার মধ্যেই যুক্তি খুঁজে পাচ্ছে।

টাক একটি হচ্ছে চুল উঠে যাওয়া। আরেকটি হচ্ছে চুল ফেলে দেওয়া। একটি প্রাকৃতিক, আরেকটি কৃত্রিম টাক। চুল ফেলে দেওয়া কখনো কখনো প্রতিবাদের ভাষা হয়েও ওঠে। মাথার চুল সৌন্দর্যের প্রতীক। কিন্তু নান্দনিক বোধের সঙ্গে আপস করে কখনো কখনো ন্যাড়া হওয়ার ঘটনা প্রতিবাদেও ভাষা হয়ে ওঠে। 

পৃথিবীজুড়ে নানা সময়ে নানা ইস্যুতে মানুষ ন্যাড়া হওয়াটাকে প্রতিবাদেও অস্ত্র কওে তুলেছে। বাংলার ব্রাক্ষ্মণ ধর্মেও প্রতিবাদে ধর্ম চর্চা হিসেবে বাংলার একটি প্রান্তিক ধর্মীয় সম্প্রদায়ের উদ্ভব হয়েছি, যারা মাথা ন্যাড়া-নেড়ি সম্প্রদায় হিসেবে পরিচিত। 

মানুষের জন্য আন্দোলনে নেমে সারাজীবন মাথা ন্যাড়া করে রেখেছিলেন মহাত্মা গান্ধী। ২০১৭ সালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নেওয়াজ শরীফের পদত্যাগের দাবিতে একজন পিটিআই কর্মী মাথা নেড়ে করে রাস্তায় নেমেছিলেন। ম্যানিলায় একটি কম্পানির শ্রমিক ছাটাইয়ের প্রতিবাদে ২৪ জন শ্রমিক মাথা ন্যাড়া করে রাস্তায় নেমেছিলেন ২০১৭ সালের প্রথম দিকে। আবার সিঙ্গাপুরে শিশুদের ক্যান্সার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে ন্যাড়া কর্মসূচির আয়োজন করেছিল একটি সংগঠন। মোট ছয় হাজার ব্যক্তি মাথা ন্যাড়া হয়ে এই কর্মসূচিতে যোগ দিয়েছিলেন ২০০৩ সালে।

২০২০ সালে এ ধরণের কোনো কর্মসূচি নেই। আরামবোধ, সেলুনে যাওয়ার ঝামেলা, ঘরে থেকে সময় পার করার মধ্যে ন্যাড়া হওয়ার মধ্যে আনন্দ খুঁজে পাচ্ছে মানুষ। তবে এটাতো হতে পারতো করোনাভাইরাস (কভিড-১৯) থেকে রক্ষার জন্য মানুষকে সচেতন করার একটি স্লোগান, 'আসুন ন্যাড়া হই, ঘরে থাকি, ভালো থাকি।’