এই দিন

রোববার   ১১ এপ্রিল ২০২১   চৈত্র ২৮ ১৪২৭   ২৮ শা'বান ১৪৪২

১০৩

মানুষ সুন্দর চামড়ায় না, হৃদয়ে 

প্রকাশিত: ৪ মার্চ ২০২১  

গায়ের রং কালো হওয়ায় আমাদের সমাজে বর্ণ বৈষম্যের শিকার হয়নি এমন ব্যক্তি খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে এ যেন এক বিশেষ অভিশাপ।

পরিবার-স্কুল-কলেজ-কর্মজীবনে সর্বত্র তাকে কালো হওয়ার যন্ত্রণা বয়ে বেড়াতে হয়। আর ছেলেদের ক্ষেত্রে কয়েকটি শব্দের কথা উল্লেখ করা যাক— ‘কাল্লু’, কালাইয়া’, ‘কালা’। কৃষ্ণবর্ণের ছেলেদের এমন বর্ণবাদী বিশেষণে বিশেষায়িত হওয়া যেন স্বাভাবিক বিষয়।  

কিন্তু ঘোর কালো’রা কৃষ্ণের মতো পুজিত নন, বরং সমাজের সব জায়গায় তারা অবহেলা ও নিগৃহীত।  আমাদের শ্যামল বরণ দেশেও রয়েছে সাদা বা ফর্সা চামড়ার প্রতি এক বিশেষ আকর্ষণ ও আগ্রহ।  

সাদা যেন এক বিশেষ প্রতিভা, ধনবান, শিক্ষিত ব্যক্তি ও জাতি—যুগ-যুগান্ত ধরে এমন এক ধারণায় গড়ে উঠেছে আমাদের সমাজে। এটাও যেন এক ‘কলোনিয়াল হ্যাংওভার’; যা আমরা প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম টেনে নিয়ে যাচ্ছি।  

সমাজের ভেতর এমন বর্ণ-বৈষম্য দেখে বিংশ শতাব্দীতে দারুণ এক প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছিলেন বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত কথা সাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দোপাধ্যায়। কালজয়ী ‘কবি’ উপন্যাস তিনি লেখেন— ‘কালো যদি মন্দ তবে কেশ পাকিলে কাঁদ কেনে?/কালো কেশে রাঙা কুসুম হেরেছ কি নয়নে?’ 

কালো যদি না থাকে তবে সাদার মর্ম থাকে কি? এ যেন পিঠেপিঠি দুই সহোদর। সাদাকালো। কালোদের অবহেলিত-নিগৃহীত হওয়ার বিষয় নিয়ে পৃথিবীতে অসংখ্য উপন্যাস, সিনেমা, কবিতা রচিত হয়েছে। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে তথ্য-প্রযুক্তির এই সভ্যতায় এসেও যেন, সেই পুরনো কাসুন্দি; কালো-সাদার বর্ণবাদী দ্বন্দ্ব এখনও বিরাজমান। এই দ্বন্দ্ব যতটুকু শারীরিক, তারচেয়ে বেশি মানসিক। আমরা এমন এক সমাজে বেড়ে উঠি, যেখানে সুন্দরের প্রতিমূর্তি হিসেবে সাদাকেই প্রাধান্য দেওয়া হয় সর্বক্ষেত্রে।  

অথচ কত সময় আগে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মাঠের ভ্রমর কালো মেয়েটির প্রেমে পড়ে লিখেছিলেন, ‘কালো? তা সে যতই কালো হোক/দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ। ’

একটা নারীর ক্ষেত্রে মাথায় দিয়ে দেওয়া হয়, সুন্দর ও সাদা না হলে পৃথিবী তোমাকে গ্রহণ করবে না। অথচ পৃথিবীতে মানুষের সৌন্দর্য তার স্বাভাবিকতায়। গায়ের রঙে কী আসে যায়? আমাদের মনে রাখতে হবে, সৌন্দর্য মূলত মানসিকতায়, মানবিক গুণাবলীতে। মানুষ সুন্দর চামড়ায় না, হৃদয়ে।

লেখা: উপল বড়ুয়া